আমি একজন নাস্তিক। আমার অবিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে চলার জন্য কোনো ধর্মবিশ্বাসীকে তাঁর বিশ্বাস ত্যাগ করতে বলি না। একইভাবে আশা করি, অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস আমার ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনার বিধান হয়ে উঠবে না। আমি কী খাব, কী পান করব কিংবা আদৌ কোনো উপাসনায় অংশ নেব কি না এসব সিদ্ধান্তে আমার স্বাধীনতারও মূল্য আছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে দুর্গাপূজা ঘিরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্য এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছিল। তিনি পূজামণ্ডপের আশপাশে মেলা নিষিদ্ধ করার কথা বলেন এবং এসব আয়োজনে মদ ও গাঁজা সেবনের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর ঘোষণাকে ‘পূজার সময় সারা দেশে কারও মদ্যপানের অধিকার থাকবে না’ বলে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। তবে মেলা ও জমায়েতের ওপর এমন বিধিনিষেধের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিল।দুর্গাপূজার সঙ্গে মদ ও গাঁজার আসরের সম্পর্ক টানার বিরুদ্ধেই ছিল তাদের আপত্তি। একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব নিয়ে কথা বলার সময় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভাষায় সংবেদনশীলতা থাকা জরুরি। তবে আমার আপত্তি শুধু একটি বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে ধর্মীয় চিন্তা ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস ও পানীয়ের ওপর প্রশ্নহীন কর্তৃত্ব দাবি করে, তারও সমালোচনা প্রয়োজন। কোনো ধর্মে মদ্যপান নিষিদ্ধ হলে সেই ধর্মের অনুসারী স্বেচ্ছায় তা বর্জন করতে পারেন। নিজের বিশ্বাস ব্যাখ্যা করতে পারেন, অন্যকে তা অনুসরণের আহ্বানও জানাতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ধর্মাচরণকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করে তোলার অধিকার তিনি কোথা থেকে পান?
এই নীতি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বা অন্য ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ যদি নিজের খাদ্যবিধি অনিচ্ছুক মানুষের ওপর চাপাতে চান, আমি তার বিরোধিতা করব। পবিত্রতার দাবি কাউকে অন্যের বিবেকের মালিক করে না। নৈতিকতার বিচারেও প্রশ্ন হওয়া উচিত: একজন মানুষের আচরণে অন্যের কী ক্ষতি হচ্ছে? তাঁর সততা, দায়িত্ববোধ ও অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা কেমন? শুধু পানপাত্রের দিকে তাকিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সবাই সমান মর্যাদায় বাঁচবেন এই প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়। কারও উৎসবকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি জনশৃঙ্খলার যুক্তি দেখিয়ে ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
আমার গ্লাস খালি থাকবে, না তাতে কোনো পানীয় থাকবে সেই সিদ্ধান্তে আমার বিবেচনা ও অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ কাজ করুক। অন্যের ধর্মের প্রতি আমার আনুগত্য যেন তার শর্ত না হয়।
লেখক: এম ডি রুম্মান হোসেন


















