ঢাকা , শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের বিদ্যুৎ সংকটের দায় কার? নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও বর্তমান বাস্তবতা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে লোকসান ও বাজার সংস্কারের উদ্যোগ ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প: মাঠ কাঁপাতে প্রস্তুত বসুন্ধরা কিংস দুর্নীতির অভিযোগে ঘেরা ইউনূস সরকারের উপদেষ্টারা, তদন্তের অপেক্ষায় দেশ আস্থা ফেরাতে নতুন উদ্যোগ, গুলশানে হচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মডেল শাখা শিল্পের নামে নদী দখল, মেঘনার ২৪১ একর জমি উদ্ধারের সুপারিশ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্কোয়াশ ২০২৬ এর জমকালো সমাপনী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক: দূরত্ব নয়, আলোচনার টেবিলেই সমাধান প্রশাসন, নিয়মিত অভিযান: রূপগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে সাফল্যের গল্প

বিদ্যুৎ সংকটের দায় কার? নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও বর্তমান বাস্তবতা

  • Avatar Md. Jakir Hossain
  • আপডেট টাইম : ০৭:৫৯:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪৪ টাইম ভিউ

​বিশেষ প্রতিনিধি:

​বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান সরকারকে চরম বিড়ম্বনায় ফেলেছে। এর পেছনে যে কারণটি রয়েছে তা সাধারণের ধারণার বাইরে।
অভিজ্ঞরা মনে করছেন আন্তবর্তী কালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস ও তার জ্বালানি উপদেষ্টা ফয়জুলের ভুলই বর্তমান সংকটের সূতিকাগার। এনিয়েই সূচিত হয়েছে এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।

বিদ্যুৎ সংকট বিগত ১৫ বছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তৎকালীন সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে জ্বালানি খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের গৃহীত একাধিক বিতর্কিত ও স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ খাত গভীর সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
​বাতিলকৃত প্রকল্প ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা: দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার ২০১০ সালের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ (দায়মুক্তি আইন)-এর অধ্যাদেশ বাতিল করার ঘোষণা দেয়। তবে বাস্তবে পূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বহাল রেখে কেবল পাইপলাইনে থাকা সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়।
৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এসব প্রকল্প বাতিলের পেছনে নীতিগত দ্বৈততার অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ৫,২৩৮ মেগাওয়াটের জন্য ৫৫টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও ‘সভরেন গ্যারান্টি’ বা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা না থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো আগ্রহ দেখায়নি। মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের জন্য আবেদন জমা পড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ।
​বকেয়া ঋণের বিশাল বোঝা: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের মেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ না করে বাকিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ের নীতি অনুসরণ করা হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোরই পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় নতুন সরকার চরম আর্থিক চাপে পড়েছে। কয়লা ও গ্যাসের বকেয়া না মেটানোর কারণে বর্তমানে একাধিক প্রধান কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
​বিতর্কিত এলএনজি চুক্তি ও রামপাল প্রকল্প
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশগ্রহণকালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্জেন্ট এলএনজি’র সঙ্গে নন-বাইন্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে অন্ধকারে রেখে এবং উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া সম্পাদিত এই চুক্তিকে বিশেষজ্ঞরা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল বা পুনর্বিবেচনার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ড. ইউনূসের সরকার।
​বিদ্যুৎ খাত এখন ‘আইসিইউতে’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে মন্তব্য করেন, “পূর্বের সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাত নড়বড়ে অবস্থায় থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনা এটিকে মূলত আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে।” তিনি জানান, সংকট উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের বাতিল করা ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পুনর্বহালের উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়।
​বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বকেয়া বিল জমিয়ে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের ফলেই আজকের এই চরম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এটি বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে জনরোষের মুখোমুখি করার জন্য কোনো পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ট্যাগ:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক তথ্য সম্পর্কে
Avatar

Md. Jakir Hossain

ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের

বিদ্যুৎ সংকটের দায় কার? নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও বর্তমান বাস্তবতা

আপডেট টাইম : ০৭:৫৯:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​বিশেষ প্রতিনিধি:

​বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান সরকারকে চরম বিড়ম্বনায় ফেলেছে। এর পেছনে যে কারণটি রয়েছে তা সাধারণের ধারণার বাইরে।
অভিজ্ঞরা মনে করছেন আন্তবর্তী কালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস ও তার জ্বালানি উপদেষ্টা ফয়জুলের ভুলই বর্তমান সংকটের সূতিকাগার। এনিয়েই সূচিত হয়েছে এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।

বিদ্যুৎ সংকট বিগত ১৫ বছরে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তৎকালীন সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে জ্বালানি খাতের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের গৃহীত একাধিক বিতর্কিত ও স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ খাত গভীর সংকটে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
​বাতিলকৃত প্রকল্প ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা: দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার ২০১০ সালের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ (দায়মুক্তি আইন)-এর অধ্যাদেশ বাতিল করার ঘোষণা দেয়। তবে বাস্তবে পূর্বে সম্পাদিত চুক্তিগুলো বহাল রেখে কেবল পাইপলাইনে থাকা সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়।
৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এসব প্রকল্প বাতিলের পেছনে নীতিগত দ্বৈততার অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ৫,২৩৮ মেগাওয়াটের জন্য ৫৫টি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলেও ‘সভরেন গ্যারান্টি’ বা রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা না থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো আগ্রহ দেখায়নি। মাত্র ৯০০ মেগাওয়াটের জন্য আবেদন জমা পড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ।
​বকেয়া ঋণের বিশাল বোঝা: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের মেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ না করে বাকিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ের নীতি অনুসরণ করা হয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোরই পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসের পর থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় নতুন সরকার চরম আর্থিক চাপে পড়েছে। কয়লা ও গ্যাসের বকেয়া না মেটানোর কারণে বর্তমানে একাধিক প্রধান কেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
​বিতর্কিত এলএনজি চুক্তি ও রামপাল প্রকল্প
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে অংশগ্রহণকালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্জেন্ট এলএনজি’র সঙ্গে নন-বাইন্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে অন্ধকারে রেখে এবং উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া সম্পাদিত এই চুক্তিকে বিশেষজ্ঞরা জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল বা পুনর্বিবেচনার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ড. ইউনূসের সরকার।
​বিদ্যুৎ খাত এখন ‘আইসিইউতে’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে মন্তব্য করেন, “পূর্বের সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাত নড়বড়ে অবস্থায় থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনা এটিকে মূলত আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে।” তিনি জানান, সংকট উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের বাতিল করা ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পুনর্বহালের উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়।
​বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বকেয়া বিল জমিয়ে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের ফলেই আজকের এই চরম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এটি বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে জনরোষের মুখোমুখি করার জন্য কোনো পরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।