সামনে থেকে আলবদর বাহিনী তুলে নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী শল্যচিকিৎসক ডা. আজহারুল হককে। একই সঙ্গে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ডা. হুমায়ুন কবীরকেও তুলে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী। পরদিন ১৬ নভেম্বর সকালে তাদের মরদেহ পাওয়া যায় নটর ডেম কলেজের দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় কালভার্টের নিচে। উদ্ধারের সময় তাদের হাত, পা ও চোখ বাঁধা ছিল। শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন।
এই দুই চিকিৎসককে হত্যার মধ্য দিয়েই মূলত সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে সুপরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশার বাস্তবায়ন। ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর শুরু হওয়া বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড একাধারে চলে ১৬ ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত। সুপরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম দুই হোতা আলবদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। স্বাধীনতার চার দশকের বেশি সময় পর ২০১৩ সালে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের ফাঁসির রায় দেন আদালত। তবে তারা পলাতক থাকায় রায় ঘোষণার ১০ বছর পরও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে যখন বাঙালির বিজয় প্রায় নিশ্চিত, সেসময় এদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনকশা করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একমাত্র কারণ ছিল দেশকে পুরোপুরি জ্ঞান-বিজ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তার প্রসারতা শূন্য করা। কারণ বুদ্ধিজীবীরা তাদের জ্ঞান, মেধা, চিন্তার প্রসারতা ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান।
মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে যখন বাঙালিদের বিজয় প্রায় নিশ্চিত, সেসময় এদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনকশা করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একমাত্র কারণ ছিল দেশকে পুরোপুরি জ্ঞান-বিজ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তার প্রসারতা শূন্য করা।
একাত্তরে বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যে বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছে, এক্ষেত্রে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তিই পারে গোটা জাতি এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা মেটাতে। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অন্যতম দুই হোতা, গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণাকালে এ কথা বলেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ মেধাশূন্য করতে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে হানাদারবাহিনী
২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। স্বাধীনতার চার দশকের বেশি সময় পর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও রায় ঘোষণার সময় এজলাসে আসামির কাঠগড়া ছিল শূন্য। কারণ, স্বাধীনতার পরপরই মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান বিদেশে পালিয়ে যান। এজন্য পলাতক ঘোষণা করে তাদের অনুপস্থিতিতেই শেষ হয় বিচারকাজ। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও এসব আসামিকে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করা যায়নি।
ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন। তখন ট্রাইব্যুনালের সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম। এ সময় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন সাক্ষী এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তানদের কাছে বিজয় এখনো ‘অসম্পূর্ণ’
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, ‘আশরাফুজ্জামান ছিলেন বুদ্ধিজীবী নিধন পরিকল্পনার চিফ এক্সিকিউটর, মুঈনুদ্দীন ছিলেন অপারেশন ইনচার্জ। তাদের অংশগ্রহণে যেমন বন্দুকের নলের মুখে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছে, তেমনি পুরো হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিষয়ে তারা সবকিছু জানতেন। এজন্য বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের জন্য তাদের ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের দায় ও ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় রয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর আশরাফুজ্জামানের একটি ডায়েরি পাওয়া যায়, যা তাদের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অন্যতম প্রমাণ। ডায়েরিতে ১৯ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও ঠিকানা লেখা ছিল। পাকিস্তানি গবেষক সেলিম মনসুর খালিদের লেখা আলবদর বইয়ের লেখকের কাছে আশরাফুজ্জামান ডায়েরি লেখার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী যেসব অপরাধ হয়েছে সেগুলোর বিচারে গঠিত দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এটি ছিল নবম মামলার রায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলার রায় হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সদস্য (রুকন) আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। তিনিও পালিয়ে যাওয়ায় তার অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছিল।
মুঈনুদ্দীন-আশরাফের হত্যার শিকার ১৮ বুদ্ধিজীবী
মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলায় একাত্তরে ১৮ বুদ্ধিজীবীকে হত্যাসহ ১১টি অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার সবকয়টি প্রমাণিত হয়েছে। যেসব বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তারা হলেন দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন, পিপিআইয়ের (পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল) প্রধান প্রতিবেদক সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক এ এন এম গোলাম মোস্তফা, বিবিসির সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমেদ, শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীন, দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সার, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক সিরাজুল হক খান, ড. মো. মুর্তজা, ড. আবুল খায়ের, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও কার্ডিওলজির অধ্যাপক ফজলে রাব্বী ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আলীম চৌধুরী। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাত থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ পরে পাওয়া যায় রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে। এছাড়া কয়েকজনের মরদেহের খোঁজ মেলেনি এখনো।
রায়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার বিবরণ
ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, চূড়ান্ত বিজয়ের আগমুহূর্তে সুপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বুদ্ধিজীবীদের তাদের বাসা থেকে অপহরণ করে আলবদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী নিধনের নেতৃত্ব দেওয়া মুঈনুদ্দীন একাত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন। এজন্যই অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে অপহরণের সময় তিনি মুঈনুদ্দীনকে চিনতে পেরেছিলেন।
বুদ্ধিজীবী নিধনের ‘অপারেশন ইনচার্জ’ হিসেবে মুঈনুদ্দীন শুধু নিধনে নেতৃত্বই দেননি, নিজেও অংশ নিয়েছেন। বন্দুকের নলের মুখে বাসা থেকে অপহরণ করে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে যাওয়া হতো মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা কলেজে স্থাপিত আলবদরের সদর দপ্তরে। সেখানে তাদের চরম নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো রায়েরবাজার বা মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে।
রায়ে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর আশরাফুজ্জামানের একটি ডায়েরি পাওয়া যায়, যা তাদের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অন্যতম প্রমাণ। ডায়েরিতে ১৯ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও ঠিকানা লেখা ছিল। পাকিস্তানি গবেষক সেলিম মনসুর খালিদের লেখা আলবদর গ্রন্থ অনুসারে, ওই বইয়ের লেখকের কাছে আশরাফুজ্জামান ডায়েরি লেখার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।
ডা. আলীম চৌধুরী হত্যাকাণ্ড নিয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আলীম চৌধুরীকে অপহরণের সঙ্গে মাওলানা আবদুল মান্নান জড়িত ছিলেন। একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর মান্নানকে রমনা থানায় সোপর্দ করা হলেও পরে অজ্ঞাত কারণে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জাতির জন্য লজ্জা, মাওলানা মান্নান পরে স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: ব্যারিস্টার মোঃ মনির হোসেন, যোগাযোগ অফিস : ১৯ তলা ইউটিসি বিল্ডিং, কাওরানবাজার, ঢাকা, ১২১৫, মোবাইল : ০১৩২৭-০২২২৮১, ইমেইল : deshnews04@gmail.com
© স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২-২০২৩ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি